চট্টগ্রাম, শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

গণমাধ্যম বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন

ইতিহাস গড়লো চবি

তাসনিমা জাহান

পরিসর.কম

প্রকাশিত : ১০:৪৮ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ১০:৫৬ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার

ইতিহাস গড়লো চবি

ইতিহাস গড়লো চবি

“এই প্রথম আমি একাধিক বিদেশি প্রফেসরের সাথে সামনাসামনি কথা বললাম। মিডিয়া বিষয়ে তাদের কাছ থেকে যেমন অনেক কিছু জানতে পেরেছি, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্মেলন সম্পর্কে আমার যাবতীয় ভীতি পুরোপুরি দূর করতে পেরেছি।” এভাবেই প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান। শুধু নাইমুরই নয়, আরো অনেক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। দেশে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে তাদের নতুন এই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে চবিও জন্ম দিল নতুন এক ইতিহাসের। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ভবনে গত ১৭-১৯ জুলাই তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল “মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম: প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেন্জেস ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড বিয়ন্ড”। দেশের ১০টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, মালয়েশিয়া ও রাশিয়া থেকে আগত গণমাধ্যম গবেষকরা এ সম্মেলনে অংশ নেন। তিনটি প্ল্যানারি ও ১৫টি প্যারালাল সেশনে বিন্যস্ত সম্মেলনটিতে ৭৩ জন গবেষক তাদের মোট ৫৭টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। সমাপনী অধিবেশনে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ইতিবাচক খবরের চাইতে নেতিবাচক খবর বেশি প্রাধান্য পায়। এতে বস্তূনিষ্ঠতা ক্ষুণ্ন হয়। নিয়মিত এমন সম্মেলন আয়োজন করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার সমস্যাগুলো যেমন সহজে চিহ্নিত হবে তেমনি এর সমাধানের দিকনির্দেশনাও পাওয়া যাবে। প্রথম দিন (১৭ জুলাই ২০১৮) উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছাড়াও সম্মেলনের প্রথম দিনটি সাজানো হয় একটি প্ল্যানারি এবং চারটি প্যারালাল সেশন দিয়ে। প্ল্যানারি সেশনে “এশিয়ায় মিডিয়া ও সাংবাদিকতা গবেষণা” বিষয়ে নিজ নিজ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিপ্লব লহ চৌধুরী, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান এবং মালয়েশিয়ার যোগাযোগ গবেষক অধ্যাপক ড. জামিলা হাজ আহমেদ। পরে “রিশেপিং প্রফেশনাল জার্নালিজম”, “মিডিয়া অ্যান্ড জেন্ডার রিপ্রেজেন্টেটেশন”, “নিউ মিডিয়া, ইউথ অ্যান্ড পলিটিক্যাল এংগেজমেন্ট” এবং “কমিউনিটি কমিউনিকেশন অ্যান্ড কমিউনিটি রেডিও” বিষয়ে ৪টি প্যারালাল সেশনে আরোও ১২টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. বিপ্লব লহ চৌধুরী বলেন, “আমরা আমাদের সমস্যা নিয়ে বেশি দূর এগোতে পারছি না, কারন আমাদের মধ্যে প্রচারের প্রবণতা বেশি। আমাদেরকে প্রচারের চেয়ে সমস্যা সমাধানের প্রতি বেশি জোর দিতে হবে।`’ ভূটানের সাংবাদিক তাশি দেমা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভুটানি নারীদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার দিক তুলে ধরেন।

অপরদিকে, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ দাস ভারতীয় মিডিয়ায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য জনসংযোগের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন ড. জামিলা হাজ। এছাড়াও তিনি নাগরিক সাংবাদিকতার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে তা একটি দেশের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে তা তুলে ধরেন। প্রতি অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বটি ছিল শ্রোতাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বক্তা ও শ্রোতারা প্রানবন্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিষয়গুলোকে সবার কাছে আরো পরিস্কার করে তুলেন। দ্বিতীয় দিন (১৮ জুলাই ২০১৮) দ্বিতীয় দিনের সকালে অনুষ্ঠিত প্ল্যানারি সেশনের মূল বিষয় ছিল “দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতা শিক্ষা: সমস্যা ও সম্ভাবনা”। এ বিষয়ে নিজ নিজ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নেপালের পূর্বাঞ্চল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার লক্ষণ দত্ত পান্ট, ভূটানের সাংবাদিক তাশি দেমা ও ভারতের অধ্যাপক ড. সি.এস.এইচ.এন. মূর্তি। পরবর্তীতে “মিডিয়া, মাইনরিটি অ্যান্ড রোহিঙ্গা ক্রাইসিস”, “মিডিয়া প্রোগ্রাম: পলিসি অ্যান্ড অডিয়েন্স”, “ফেইক নিউজ, মিডিয়া বায়াসনেস অ্যান্ড সোসাইটি”, “পাওয়ার, ইনইক্যুলিটি অ্যান্ড সোশাল মুভমেন্ট” এবং “ইনফরমেশন রাইটস অ্যান্ড মিডিয়া ইথিকস” শিরোনামের পাঁচটি প্যারালাল সেশনে যথারীতি গবেষকরা তাদের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়া আরো দুটি সেশনে বিভাগের মোট ১১জন শিক্ষার্থী তাদের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সব মিলিয়ে সেদিন মোট ২৩টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তাশি দেমা বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া সাংবাদিকতা করার ফলে অনেকের কাজই ত্রুটিপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্ষেত্রে শেখানো পশ্চিমা তত্ত্ব ও আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে সেগুলোর বৈসাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক মূর্তি। তিনি ভীনদেশি তত্ত্বের পরিবর্তে নিজেদের সমাজের সাথে প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব তৈরির জন্য গবেষকদের প্রতি আহবান জানান। তৃতীয় দিন (১৯ জুলাই ২০১৮) সম্মেলনের প্রথম দুদিন শিক্ষার্থীদের আনাগোনা কিছুটা কম হলেও, শেষ দিন তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেদিন সকালের প্ল্যানারি সেশনটি ছিল “নতুন মিডিয়া প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার নতুন সুযোগ” শীর্ষক। এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন চীনের অধ্যাপক ড. জিয়াওজি সু ও রাশিয়ার অধ্যাপক সার্গেই দেভিদভ। প্ল্যানারি সেশন শেষে “ট্রাডিশন ভার্সেস মডার্ন: প্রফেশনাল জার্নালিজম অ্যান্ড নিউ মিডিয়া”; “মিডিয়া অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: দ্যা পাস্ট অ্যান্ড দ্যা ফিউচার”; “পলিটিক্যাল ক্যামপেইন, পাবলিক রিলেশন অ্যান্ড ইউসেজ অব সোশ্যাল মিডিয়া”; “জার্নালিজম এডুকেশন অ্যান্ড প্র্যাকটিস” শিরোনামে চারটি প্যারালাল সেশনে বারোটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। সাংবাদিকতার নতুন সুযোগ-সম্ভাবনা নিয়ে সেদিনের সেশন বেশ আলোচনামুখর ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাহমিনা হক দিনা তার প্রবন্ধে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক চর্চার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পার্থক্য এবং চাকুরি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহারিক চর্চা বৃদ্ধির প্রতি জোর দেন।

লোকসংস্কৃতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ভারত হতে আগত ড. বিশ্বজিৎ দাস বলেন, গ্রামীণ সমাজে, যেখানে আধুনিক সভ্যতা পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য লোকসংস্কৃতি ব্যবহার করা খুবই প্রয়োজন। তিনি বলেন লোকসংস্কৃতিকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে সরকার প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারছে। লোকসংস্কৃতির এই আধুনিকায়নকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখলেও প্রশ্নোত্তর পর্বে এ বিষয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের কারণে লোকসংস্কৃতি তার নিজস্ব শিহরণ হারাচ্ছে বলে মত দেন অনেকে। সম্মেলন শেষে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিভাগের এই আয়োজনের ফলে তারা বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছে। গণমাধ্যম বিষয়ক অ্যাকাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তারা দেশি-বিদেশি গবেষকদের সাথে আলাপ করে নিজেদের উন্নয়ন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার সম্পর্কে অনেক নির্দেশনা পেয়েছে বলে জানায়। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুজহাত তুরী তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “প্রথমবারের মতো নিজের তৈরি গবেষণাপত্র দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য গবেষকদের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছি। তারা খুব প্রশংসা করেছেন এবং আমার ভুলত্রুটি দেখিয়ে দিয়েছেন। এটা বিরাট একটা অভিজ্ঞতা।“ তুরীসহ বিভাগের বাকি শিক্ষার্থীরাও এই আয়োজনের ব্যাপক প্রশংসা করেন। এমন আন্তর্জাতিক সম্মেলন নিয়মিত আয়োজন হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।