চট্টগ্রাম, সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯

চবির অগোছালো ওয়েবসাইট

দরকার নিয়মিত আপডেট

পরিসর.কম

প্রকাশিত : ০৩:৪৬ এএম, ২৯ মে ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ১২:৩৮ পিএম, ২৯ মে ২০১৭ সোমবার

দরকার নিয়মিত আপডেট

দরকার নিয়মিত আপডেট

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম। শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৫ বছর ধরে। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকার কথা। কিন্তু নেই। এমনকি এই শিক্ষকের নামই অন্তর্ভুক্ত হয় নি ওয়েবসাইটে।

শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি, বিভাগীয় সভাপতির পরিবর্তনসহ আরও অনেক বিষয়ে দরকারি তথ্যগুলোও ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপডেট করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওয়েবসাইট ঘেঁটেও সেসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি, কিংবা অনুপস্থিতি, বিভাগে বিভাগে পুরোনো তথ্যে ভরপুর দেশের অন্যতম এই বিদ্যাপীঠের গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিচ্ছবি হচ্ছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট। সে হিসেবে ওয়েবসাইটটি হওয়া চাই গোছানো ও তথ্যসমৃদ্ধ। ওয়েবসাইট ব্রাউজ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় তথ্য চট করে পাওয়া যাবে। এমনকি বিদেশি কোনো শিক্ষার্থী বা গবেষক সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা বা গবেষণা করতে চাইলে তাদের জন্যও প্রয়োজনীয় তথ্য থাকতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে। কারণ একজন শিক্ষার্থী বা গবেষকের পক্ষে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তথ্য জানা সম্ভব হয় না।

এক্ষেত্রে চবির ওয়েবসাইটটি কতটা গোছানো? কতটা আকর্ষণীয়? আর কতটাই বা তথ্যবহুল? এমনসব প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অনেকেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন চবির ওয়েবসাইটটি মোটেই সমৃদ্ধ নয়।

কারণ হিসেব তারা বলছেন, উল্লেখযোগ্য কোনো সেবা বা তথ্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে পাচ্ছেন না।

ওয়েবসাইটটিতে একদিকে যেমন তথ্যগুলো আপডেট হয় না অন্যদিকে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্যও মেলে না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত নানা তথ্য, জার্নাল, ভর্তি প্রক্রিয়া, গবেষণা প্রক্রিয়া, স্কলারশিপ সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায় না এই ওয়েবসাইট থেকে।

এ বিষয়ে লোক প্রশাসন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখানে শুধু ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট ছাড়া আর কোনো রেজাল্টই ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় না।’

দর্শন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. আমিনুল হক জানালেন আপডেটেড ওয়েবসাইট না থাকায় কি সমস্যায় পড়েছেন সে কথা। তিনি বলেন, ‘আমি জার্মানির হামবোল্ট ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলাম। আমার রেজাল্ট সিজিপিএ-থ্রি পয়েন্টের ওপরে। কিন্তু আমাদের এখানে সিজিপিএ এবং জার্মানির সিজিপিএ সিস্টেম এক নয়। তাই আমার এই রেজাল্টের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে। কিন্তু তারা সেখানে কোনো তথ্য না পাওয়ায় আমার আবেদনটি বাতিলের কথা বিবেচনা করছিল। তারা আমাকে মেইল করে জানায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সিস্টেম, সিলেবাস এবং সিজিপিএ প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য পায়নি। পরবর্তীতে আমি রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গিয়ে দ্রুত সবকিছুর হার্ডকপি জোগাড় করি এবং সেগুলো স্ক্যান করে তাদের মেইল করি।’

‘এটা খুবই দুঃখজনক যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো থাকবে না,’ বলেন এই শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই মাস্টার্স শেষে এমফিলের জন্য আবেদন করেন। আবার অনেকেই বিভিন্ন গবেষণার সাথে জড়িত থাকেন। এসব গবেষণা কার্যক্রমের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো দিক নির্দেশনা নেই চবি ওয়েবসাইটে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ধরণের গবেষণা হচ্ছে সে সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য থাকা দরকার ছিল ওয়েবসাইটে। কিন্তু তা নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে ভূমিকাকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে এ সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য তথ্য না থাকায় র‌্যাংকিংয়েও চবি পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের  প্রকাশিত গবেষণাগুলো পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে কোনো শিক্ষার্থী যদি গবেষণা করতে চায় সে সম্পর্কিত তথ্যই ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় না।’

এতে সম্মতি জানান তানভীরের দুই সহপাঠী এস এম ইমরান ও ইসরাত জাহান সাথী।

চবির সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘একটি বিভাগের একজন সভাপতি দায়িত্ব শেষ করে নতুন কেউ এসেছেন। এমন বিষয়গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। এছাড়া শিক্ষকদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় না। তাই এর উন্নয়নে আরও বেশি কাজ করা দরকার।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের এমন করুণ দশার কারণ অনুসন্ধানে উঠে আসে নানা বিষয়। দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট থেকে যথাসময়ে তথ্যগুলো ওয়েবসাইটে আপডেটের জন্য সরবরাহ করা হয় না। আবার ওয়েবসাইট চালানোর জন্য জনবলের রয়েছে চরম সংকট।

ওয়েবসাইট পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম এ বিষয়ে বলেন, ‘জনবল স্বল্পতায় ওয়েবসাইটের কাজগুলো যথাযথভাবে করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাত্র দুজন স্টাফ দিয়ে পুরো বিষয়টি সামলাতে হচ্ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ওয়েবসাইটের এমন করুণ দশার কথা স্বীকার করেছে। তবে ওয়েবসাইট আধুনিকায়নে আশু পদক্ষেপের আশ্বাসবাণী শোনালেন রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কামরুল হুদা।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীবান্ধব একটি ওয়েবসাইট নির্মাণের জন্য আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। এটি সম্পন্ন হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই রেজাল্ট, প্রবেশপত্র, ট্রান্সক্রিপ্ট ইত্যাাদি সেবা পাবেন। আর এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন।’

বিকেন্দ্রীকরণে ঢেলে সাজাতে হবে চবির ওয়েবসাইট: অধ্যাপক হানিফ সিদ্দিকী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ওয়েবসাইটকে ‘অনাকর্ষণীয়’ বলে মত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হানিফ সিদ্দিকী বলেছেন, এই ওয়েবসাইটে গ্রাফিক্স ডিজাইন, তথ্যের বিন্যাস, তথ্যের সহজলভ্যতা মোটেই তৃপ্তিদায়ক নয়।

অধ্যাপক ড. মো. হানিফ সিদ্দিকী

একজন অভিজ্ঞ গ্রাফিক্স ডিজাইনার দিয়ে ওয়েবসাইটটি সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে চবি চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষকেরা একটি সুন্দর ডিজাইন করতে পারেন যেটিকে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে ওয়েবে রুপ দেওয়া যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন তিনি।   অধ্যাপক হানিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘সাইটটিকে পরিপাটি করে সাজাতে হবে। প্রতিটি অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউটের আলাদা আলাদা বিবরণ যাতে সহজে পাওয়া যায় সেভাবে সাজাতে হবে।

বিদেশে বসেও যেন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সম্পর্কে, পড়াশুনা, গবেষণা, পঠন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’  বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটকে মানসম্পন্ন করার বিশাল কর্মযজ্ঞকে সহজতর করতে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি বলে মনে করেন হানিফ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বিভাগ দায়িত্ব নিয়ে নিজ নিজ তথ্য তৈরি করে ওয়েবসাইটে আপলোড করতে পারে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোনও বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পরিবর্তন, বিভাগীয় নোটিশ, কোনো শিক্ষকের কোনো গবেষণা ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিভাগ ওয়েবসাইটের চ্যানেলে দেবেন। পরবর্তীতে ওয়েবসাইটের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রকগণ সেটিকে অনুমোদন দিলে তা ওয়েব সাইটে দেখা যাবে।’  বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল তিনটি কাজকে প্রাধান্য দিয়ে ওয়েবসাইট সাজাতে পরামর্শ দিলেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল জ্ঞান সমৃদ্ধকরণ বা সংরক্ষণ, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং জ্ঞান বিতরণ। এই তিনটি লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আমাদের ওয়েবসাইটেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র, দেশি-বিদেশি প্রয়োজনীয় বই ও রেফারেন্স কপিরাইটের কথা মাথায় রেখে পিডিএফ আকারে থাকতে পারে।’