চট্টগ্রাম, শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

ব্লু-ইকোনমি

সমুদ্রের সদ্ব্যবহারে ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি

রাকিব উদ্দীন

পরিসর.কম

প্রকাশিত : ১১:০৮ পিএম, ২৭ জুলাই ২০১৯ শনিবার | আপডেট: ১১:১৪ পিএম, ২৭ জুলাই ২০১৯ শনিবার

ব্লু-ইকোনমি

ব্লু-ইকোনমি

সুনীল জলরাশি। অঢেল সম্পদ। শুধু ক্ষণিকের বিলম্ব। আমাদের সমুদ্রে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান। যার সদ্ব্যবহারে পাল্টে যাবে আমাদের অর্থনীতির রূপরেখা। খনিজ সম্পদ, জ্বালানি সম্পদ, মৎস্য সম্পদ কি নেই সেখানে। বিপুল সম্পদের ভাণ্ডার আমাদের ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্রে । ব্লু ইকোনমি হলো মহাসমুদ্রের সুনীল জলরাশির অন্তরালে নিহিত বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। এই ধারনার জনক প্রফেসর গুন্টার পাউলি। তার মতে,টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কর্মপরিকল্পনাই হলো ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি।২০১২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে টেকসই উন্নয়ন শীর্ষক জাতিসংঘ সম্মেলনে প্রথম উত্থাপিত হয় ‘ব্লু-ইকোনমি’ শীর্ষক ধারণা।


সেখানে উল্লেখ করা হয় `আগামীদিনের জন্য একটি সমুদ্র ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা। যার উদ্দেশ্য হবে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা`। সমুদ্র অর্থনীতি বিষয়ক কথাবার্তা বাংলাদেশে জোরেশোরে আরম্ভ হয় মূলত ২০১২ সালে মায়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পর থেকেই।
ওই ঘটনায় সমুদ্রসম্পদ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবিশাল সম্ভাবনা উম্মোচিত হয়ে যায় বাংলাদেশের সামনে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশের স্থলভাগের বাইরে জলসীমায়ও আরেকটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে । ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের বাংলাদেশের জন্য ১ লক্ষ ১৯ হাজার বর্গ কিলোমিটারের সমুদ্রসীমা আরেকটা গোটা বাংলাদেশই বটে। তবে সমুদ্র বিজয়ই চূড়ান্ত বিষয় নয়।

এই বিজয়কে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোটা জরুরী।আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পর বঙ্গোপসাগরে ভারতের হাতে থাকা ১০টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে ৮টি এবং মায়ানমারের হাতে থাকা ১৮টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে ১৩টির মালিকানা ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশ। ইউএসজিএস৫ এর প্রতিবেদন অনুসারে উপরোল্লিখিত এসব গ্যাস ব্লক থেকে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়া সম্ভব। এছাড়াও আমাদের সমুদ্রে প্রায় পনেরটি মূল্যবান খনিজ যেমন - ইলামেনাইট, জিরকোনিয়াম, টাইটেনিয়াম অক্সাইড প্রভৃতি রয়েছে যার বৈদেশিক মূল্য কোটি কোটি ডলার।২০২০ সালের মধ্যে সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ কপার, কোবাল্ট, জিঙ্ক রয়েছে তার ৫% ব্যবহার করা যাবে সমুদ্রের আকরিক থেকে, যার আর্থিক মূল্য ৫ বিলিয়ন ইউরো। ২০৩০ সালের মধ্যে এর পরিমাণ হবে দ্বিগুণ। পৃথিবীর ৩০% গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। ইন্দোনেশিয়া, সিংগাপুর, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো সমুদ্র অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে তাদের জাতীয় নীতিমালা পরিকল্পনা প্রনয়ন করেছে।



যে কারনে অর্থনীতিতে সাগর-কেন্দ্রিক আয় ও প্রবৃদ্ধিতে তারা অনেকটাই এগিয়ে । আমরা বাংলাদেশ চাইলে তাদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিতে পারি এবং আমাদের জন্য গৃহীত একটি সমুদ্র নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারি। এ কাজে বিদেশিদের সাহায্য ও পরামর্শ নেবার সাথে সাথে দেশের বাইরে যেসব বাংলাদেশী এ খাতে গবেষণা ও কাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা জরুরী।

বাংলাদেশে ব্লু- ইকোনমির চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা কতোটা রয়েছে তা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের অধ্যাপক ড. মোঃ রাশেদ- -উন-নবী রাফি পরিসরকে বলেন, আমাদের সমুদ্রে যে পরিমাণ সম্পদ আছে তার পুরোভাগেই আমরা চাইলে আয়ত্ত্বে নিয়ে আসতে পারি।আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পর আমাদের যে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে তা পুরো গোটা বাংলাদেশের সমান।যা অবশ্যই সুখকর সংবাদও বটে দেশের জন্য। আমার মতে, ব্লু-ইকোনমিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখবে মৎস্যক্ষেত্র।তার কারণ মৎস্যক্ষেত্র কখনো ফুরিয়ে যাবে না কিন্তু তেল,গ্যাসের ক্ষেত্রে সেটার শঙ্কা রয়েছে।মূলত গ্রীণ ইকোনমি থেকে ব্লু- ইকোনমি কনভার্ট হয়েছে।আমাদের সমুদ্রে কী পরিমাণ তেল ও গ্যাস আছে তা যথাযথ পরীক্ষামূলক উত্তোলন ছাড়া জানা সম্ভব নয়।সমুদ্র বিজ্ঞানের একজন লোক হিসেবে আমি বলতে চাই আমাদের সমুদ্রে যে সম্পদ আছে সেটার সুষ্ঠু ব্যবহার অতীব জরুরী।তড়িঘড়ি করে বহুজাতিক কোম্পানি দিয়ে সমুদ্র সম্পদ আহরণ করলে সেটা ফল খুব একটা ভালো হবে না। সমুদ্র সম্পদের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে একটি দেশ যে দেউলিয়া হতে পারে তার বড় দৃষ্টান্ত হলো নাইজেরিয়া।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে সম্পদ সবসময় সুখকর সংবাদ বয়ে আনে না।অনেক সম্ভাবনা ইতোমধ্যে টোকা দিতে শুরু করেছে আমাদের অর্থনীতির দরজায়। শুধু ব্লু-ইকোনমি সেল গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। কারন সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহন ছাড়া শুধুমাত্র এই সেলের পক্ষে ব্লু- ইকোনমির কৌশল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।আমরা কারো সাথে প্রতিযোগিতা করতে চাই না। আমরা আমাদের সমুদ্র সম্পদ আহরণ করে অর্থনীতিতে অবদান রাখাটা জরুরী। আমি আশাবাদী সমুদ্র সম্পদের পরিপূর্ণ ব্যবহারে আমাদের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। এরই সাথে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বারপ্রান্তে আমরা পৌঁছাতে পারবো।